স্টাফ রিপোর্টারঃ কোনো প্রকার ঘুষ, সুপারিশ কিংবা দালালের হস্তক্ষেপ ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মাত্র ১২০ টাকা আবেদন ফি দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নেত্রকোণায় চাকরি পেয়েছেন ৪২ জন তরুণ—তরুণী, দুজন পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। শারিরীক, মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে রবিবার (১৭ মে) রাত ১১টার দিকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এ সময় নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম উত্তীর্ণদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর শতভাগ স্বচ্ছতায় চাকরি পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাধারণ পরিবারের সন্তানরা। সরকারি শিশু পরিবারের (এতিমখানা) বাসিন্দা কামরুল ইসলাম ফলাফল শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেওয়ার। মাত্র ১২০ টাকায়, কোনো রকম ঘুষ ছাড়া যে চাকরি হবে তা ভাবিনি। আল্লাহ তায়ালার রহমত এবং সবার দোয়ায় আজ আমি একজন পুলিশ সদস্য হতে পেরেছি।’ তিনি দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সরকারি শিশু পরিবারে বড় হয়েছেন বলে জানান। একইভাবে পূর্বধলা উপজেলার মোছা. মাইমুনা আক্তার জলি এবং মদন উপজেলার কৃষকপুত্র সোহাগ মিয়া অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে জানান, এর আগে তারা একাধিকবার মাঠে অংশ নিয়ে ব্যর্থ হলেও এবার ১২০ টাকা খরচ করেই নিজেদের মেধা ও যোগ্যতায় চাকরিটি পেয়েছেন। কেন্দুয়া উপজেলার সিদরাতুল হাসান আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি তখন আমার বাবা মারা যান। মা ও বোনের অক্লান্ত চেষ্টায় আজ আমি এ পর্যন্ত এসেছি। সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে আমার চাকরিটি হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে নেত্রকোণার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম নবনির্বাচিতদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও কড়া সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ১২০ টাকায় চাকরি পেয়েছ, এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি মহোদয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে। আমরা চাই, আগামী ছয় মাসের ট্রেনিং শেষে তোমরা যখন মাঠে ফিরবে, জনগণ যেন তোমাদের কাছে নিপীড়নের শিকার না হয়ে প্রকৃত সেবা পায়।’ পুলিশ সুপার নবনির্বাচিত কনস্টেবলদের বাড়ি ফেরার পর কোনো প্রতারক চক্র বা দালালকে টাকা না দেওয়ার জন্য সরাসরি নির্দেশ দেন। তিনি তাদেরকে সতর্কতা করে বলেন, ‘বাড়িতে যাওয়ার পর যদি কেউ তোমাদের কাছে টাকা দাবি করে, সোজা বলে দেবে, টাকা লাগলে এসপি দেবে, আমরা কোনো টাকা দেব না।’
একই সাথে তিনি ট্রেনিংয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়টাতে আবেগবশত বিয়ে করা, উশৃঙ্খলভাবে মোটরসাইকেল চালানো এবং পাড়া—প্রতিবেশীদের সাথে কোনো প্রকার মারামারি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, মেডিকেল রিপোর্ট এবং ট্রেনিং সম্পন্ন করার আগে যেকোনো ধরনের অপরাধ বা অসতর্কতায় চাকরিটি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন— শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা, ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মাহফুজা খাতুন, নেত্রকোণা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) স্বজল কুমার সরকার প্রমুখ। গত ৫ মার্চ থেকে আবেদন শুরু হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নেত্রকোণা জেলা থেকে তিন হাজার ১০৮ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। বিভিন্ন ধাপে শারীরিক মাপ, কাগজপত্র যাচাই এবং কঠিন শারীরিক পরীক্ষা শেষে গত ৪ মে তারিখে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১১৭ জনের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে দুজন মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ৪২ জনকে নির্বাচিত করা হয়।
Leave a Reply