নিজস্ব প্রতিনিধিঃ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একে একে হারিয়েছেন স্বামী ও দুই পুত্রসন্তানকে। বয়সের ভার, শোকের গভীর ক্ষত আর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটছিল ৯০ বছর বয়সী জাহেরা বেগমের। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তো দূরের কথা, অনেক সময় খাবার জোগাড় করাও হয়ে উঠছিল কঠিন। এমন অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টের সূত্র ধরে তার পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। নেত্রকোণা সদর উপজেলার সাতপাই রেল কলোনির ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাহেরা বেগম দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে শয্যাশায়ী। স্বামী দেওয়ান আলী নেত্রকোণা খাদ্য গুদামের শ্রমিক ছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বড় ছেলে তাজউদ্দীন (৪০) ক্যানসারে এবং কিছুদিনের ব্যবধানে ছোট ছেলে ময়না মিয়া (৩৫) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরপর স্বামী ও দুই সন্তানের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন জাহেরা বেগম। বার্ধক্য, শারীরিক অসুস্থতা ও শোকের ভারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী। বর্তমানে তার আরেক ছেলে আলমগীর হোসেন মায়ের দেখভাল করলেও আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা ও ভরণপোষণের ব্যয় বহন করা তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। আলমগীর হোসেন বলেন, “মায়ের এই অবস্থা রেখে নিয়মিত কাজে যেতে পারি না। যেদিন বাইরে যাই, সেদিনও মাকে নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। সংসার চালানো আর মায়ের চিকিৎসাÑদুটোই এখন আমার জন্য বড় সংগ্রাম।” স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল ইসলাম জানান, অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বামী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে জাহেরা বেগম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় অনেক সময় প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা পেলে জীবনের শেষ সময়ে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। এদিকে জাহেরা বেগমের দুর্দশার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা নজরে আসে নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের। বিষয়টি জানার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকিউল বারীর মাধ্যমে জাহেরা বেগমের বাড়িতে নগদ আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার চিকিৎসা ও সার্বিক অবস্থার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহেরা বেগমের কষ্টের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা দ্রুত খোঁজখবর নিয়েছি। একজন প্রবীণ মা জীবনের এই কঠিন সময়ে যেন ন্যূনতম মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই আমাদের প্রধান বিবেচনা ছিল। তাই তার জন্য খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তার সার্বিক অবস্থার খোঁজ রাখতে বলা হয়েছে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা চেষ্টা করছি অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ভবিষ্যতেও তার প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে।” জাহেরা বেগমের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষরাও এগিয়ে এলে জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা স্বস্তি ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন এই বৃদ্ধা।
Leave a Reply