হাফিজ উল্লাহ চৌধুরী আলিমঃ নেত্রকোণা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়লেও কৃষকদের সুরক্ষায় নেওয়া সরকারি পদক্ষেপগুলো এখন কেবল কাগজে—কলমেই সীমাবদ্ধ। নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হলেও গত ছয় বছরে ৬২ জনের মৃত্যুও প্রশাসনের ঘুম ভাঙাতে পারেনি। অকার্যকর ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ (বজ্রনিরোধক দণ্ড) আর ‘অস্তিত্বহীন’ তালগাছ প্রকল্পের আড়ালে অরক্ষিতই রয়ে গেছে দেশের অন্যতম এই খাদ্যভাণ্ডার। মাঠজুড়ে পাকা ধান, তবুও আতঙ্কে শ্রমিকরা বর্তমানে হাওরজুড়ে সোনালি বোরো ধানের সমারোহ। তবে জীবনঝুঁকির কারণে কৃষিশ্রমিকেরা মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো হাওরে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। বাধ্য হয়ে যারা মাঠে নামছেন, তারা প্রতি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন মৃত্যুভয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ব্যাপক প্রাণহানির পরও কৃষকদের নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাওরে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে ২০২২ সালে নেত্রকোণা জেলায় ৩২টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা। কিন্তু এই প্রকল্পের কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ রয়েছে। ভুল স্থান নির্বাচন নিয়ম অনুযায়ী দণ্ডগুলো হাওরের মাঝখানে বা খোলা প্রান্তরে স্থাপনের কথা থাকলেও অধিকাংশ বসানো হয়েছে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: স্থাপনের মাত্র দুই বছরের মাথায় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ যন্ত্রই এখন অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। অস্তিত্বহীন সুরক্ষা: অনেক স্থানে স্থাপিত দণ্ডগুলোর যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে অথবা বিকল হয়ে স্রেফ খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বজ্রপাত প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে সরকার দেশজুড়ে তালগাছ রোপণের যে ঘোষণা দিয়েছিল, নেত্রকোণার হাওরে তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। স্থানীয়দের মতে, রোপণকৃত চারাগুলোর বেশিরভাগই পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে, ফলে কয়েক কোটি টাকার এই উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য: > স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, “সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে যন্ত্র দিল, কিন্তু সেগুলো হাওরের কামে আইলো না। বাজারের ছাদে খুঁটি গাড়লে কি হাওরের কৃষকের জান বাঁচব?” ছয় বছরে ৬২ জনের মৃত্যু হওয়ার পরও কেন প্রকল্পগুলো মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত এই অকার্যকর দণ্ডগুলো মেরামত করে হাওরের প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পুনস্থাপন করা না হলে আসন্ন মৌসুমে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দেশের অন্যতম প্রধান এই ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলে কৃষকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি হাওরবাসীর।
Leave a Reply