স্টাফ রিপোর্টারঃ বাংলার মাটি, মানুষ আর নদীকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য লোকজ উৎসব। সেই ধারাবাহিকতায় নেত্রকোণা জেলার বড় বাজারের বারুণী মেলা কেবল একটি মেলা নয়—এটি এক বিস্মৃতপ্রায় শৈশবের দরজা, এক জীবন্ত সংস্কৃতির আখ্যান। চৈত্র মাসের শেষভাগে, জাদুকাটা নদীুসংলগ্ন জনপদে যখন বসে এই মেলা, তখন প্রকৃতি আর মানুষের মাঝে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি হয়। দূর থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুর, ভেঁপুর আওয়াজ, টমটম গাড়ির ছন্দ—সব মিলিয়ে যেন এক মায়াবী আহ্বান। অর্ধকিলোমিটার দূর থেকেও বোঝা যায়, কোথাও উৎসব বসেছে। বারুণী মেলার উৎপত্তি ঠিক কবে—তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস নেই। তবে লোকবিশ্বাস বলছে, চৈত্র মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে, যখন শতভিষা নক্ষত্রের যোগ ঘটে, তখনই পালিত হয় এই বারুণী তিথি। এই দিনে নদীতে পবিত্র স্নানের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আত্মশুদ্ধির এক আচার সম্পন্ন করেন। ‘বারুণী’ নামটি গঙ্গার আরেক রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত—যা আবার পৌরাণিক আস্থার এক প্রতীক। এই আচারিক বিশ্বাসের পাশাপাশি মেলাটি হয়ে ওঠে এক আনন্দময় সামাজিক উৎসব। মাটির পুতুল, ষাঁড়, ঘোড়া, হাতি, পালকি—নানান রঙের খেলনায় ভরে ওঠে মেলার দোকান। শিশুদের চোখে এই খেলনাগুলোই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সামান্য পয়সা হাতে নিয়ে পুরো মেলা ঘুরে দেখার যে আনন্দ—তা আজকের ডিজিটাল যুগে প্রায় অচেনা। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকে আঠারোবাড়ির বিন্নি ধানের খই, আমতলার গুড়ের বাতাসা, উখড়া ও নানা রকমের লোকজ খাদ্য। মানুষ ভিড় ঠেলে পোটলা ভরে এসব কিনে নিয়ে যায়—শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং ঐতিহ্যের স্পর্শটুকু সঙ্গে করে বাড়ি নেওয়ার জন্য। এই মেলার প্রাণভোমরা নিঃসন্দেহে পাল সম্প্রদায়। তাদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি মাটির খেলনাগুলো শুধু শিশুদের আনন্দ দেয় না, বরং বহন করে বাংলার শত বছরের শিল্প ঐতিহ্য। শ্যামগঞ্জ, আটপাড়া কিংবা অন্যান্য অঞ্চলে এখনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু পাল পরিবার এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। তবে তাদের কণ্ঠে শোনা যায় এক ধরনের শঙ্কা—পরবর্তী প্রজন্ম কি এই শিল্পকে ধরে রাখবে? বারুণী মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নদী শুধু জলধারা নয়, এটি সংস্কৃতিরও ধারক। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সভ্যতা। তাই নদী শুকিয়ে গেলে, হারিয়ে যায় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উৎসব, গান, আচার—সবকিছুই। যদিও এসব একদিনে বিলীন হয় না, ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। এক সপ্তাহ পর যখন অষ্টমী মেলা বসে, তখন আবারও একই উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে সেই বটতলার প্রাঙ্গণ। কিন্তু বারুণী মেলার আবেগ, তার শৈশবময় টান, তার লোকজ রঙ—এসব যেন আলাদা এক অনুভূতির জন্ম দেয়। নেত্রকোণার বারুণী মেলা তাই কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি আমাদের শিকড়ের গল্প, আমাদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। আধুনিকতার চাপে যখন অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমাদের এখনও ফিরে যাওয়ার একটি জায়গা আছে, যেখানে শৈশব অপেক্ষা করে, বাঁশির সুরে ভেসে আসে চিরচেনা এক গ্রামবাংলার ডাক।
Leave a Reply