মোহনগঞ্জ প্রতিনিধিঃ নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে পেটে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এতে ওই গৃহবধূর গর্ভপাত হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার। শুধু তাই নয়, অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযুক্তকে আটক করেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের পালগাঁও গ্রামে। আহত গৃহবধূ আশা আক্তার (২১) বর্তমানে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি উপজেলার সুয়াইর গ্রামের সালমান শাহর স্ত্রী এবং তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়া (৪৫) সুয়াইর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পালগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার দিন আশা আক্তার বাবার বাড়ি পালগাঁও গ্রামে অবস্থান করছিলেন। দুপুরে তার ভাই জুয়েল মিয়ার একটি কুকুর প্রতিবেশী ফেরদৌস মিয়ার ছাগলের পাশে ঘোরাফেরা করছিল।
এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ফেরদৌস মিয়া ও তার লোকজন জুয়েল মিয়াকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। জুয়েলকে রক্ষা করতে গেলে তার বাবা দিলখুশ মিয়া ও মা সালেমা আক্তারকেও বাঁশের লাঠি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা আশা আক্তার বাধা দিতে গেলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তার পেটে লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। পরিবারের সদস্যরা জানান, লাথির আঘাতে আশা আক্তার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তার রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
দ্রুত তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা পরীক্ষা—নিরীক্ষার পর গর্ভপাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় আহত হন আশা আক্তারের বাবা দিলখুশ মিয়া, মা সালেমা আক্তার ও ভাই জুয়েল মিয়াও। তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। ঘটনার পর বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগীর বাবা দিলখুশ মিয়া মোহনগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বিএনপি নেতা ফেরদৌস মিয়াসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ দায়েরের পরই নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ফেরদৌস মিয়াকে আটক করলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের তদবিরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী আশা আক্তার বলেন, “আমার ভাইকে মারধর করা হচ্ছিল। তাকে বাঁচাতে গেলে ফেরদৌস মিয়া আমার পেটে লাথি মারে। এরপর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আমি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। এখন আমার সন্তান আর নেই।” আশার স্বামী সালমান শাহ বলেন, “হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে।
অভিযোগ করার পর পুলিশ আসামিকে থানায় নিয়ে গেলেও পরে রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে ছেড়ে দিয়েছে। এখন উল্টো বলা হচ্ছে, আগেই নাকি গর্ভপাত হয়েছিল। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।” মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ—সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার শহীদুল্লাহ বলেন, “পরীক্ষা—নিরীক্ষায় রোগীর গর্ভপাত হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। হাসপাতালের নথিতেও বিষয়টি লিপিবদ্ধ রয়েছে। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।” অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে বিএনপির স্থানীয় নেতারা অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন।
সুয়াইর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তফা জামিল স্বপন বলেন, “আমি এলাকায় নেই। শুনেছি ওই নারীর আগেই গর্ভপাত হয়েছিল। এখন মারামারির ঘটনার সঙ্গে ফেরদৌসকে জড়ানো হচ্ছে। তবে প্রকৃত ঘটনা কী, তা আমি নিশ্চিত নই।” এদিকে অভিযুক্তকে আটকের পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত পক্ষ থানায় এসেছিল। উপজেলা বিএনপির নেতারাও ছিলেন। তারা নিজেদের মধ্যে আপস—মীমাংসার কথা বলেছে। কাউকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।” যদিও এর আগে তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিতে চাননি এবং মামলা নিতে পুলিশ আগ্রহী ছিল।
পরে অভিযোগ জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে তিনি বলেন, “অভিযোগ দিয়েছে, তবে তারা মীমাংসাও করতে চাইছে।” উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম কার্ণায়েন বলেন, “ঘটনাটি খোঁজ নিয়ে সামাজিকভাবে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নারীকে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।” এদিকে অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভপাতের মতো গুরুতর অভিযোগকে ‘সামাজিক সমাধান’ করার উদ্যোগ নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়।
Leave a Reply