বিশেষ প্রতিনিধিঃ চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসে টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সৃষ্ট আগাম বন্যায় নেত্রকোণার প্রায় ৭৩ হাজার কৃষকের ২২ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়| ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার তিন মাসব্যাপী বিশেষ কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি গ্রহণ করে| এ কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে| দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সহায়তায় এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়| তবে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেতুলিয়া ইউনিয়নে এ তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে| স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম বাদ দেয়া হলেও তালিকায় স্থান পেয়েছেন এমন অনেক ব্যক্তি, যাদের কৃষিজমি নেই বা বন্যায় কোনো ক্ষতি হয়নি| অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে তালিকায় ¯স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে| তেতুলিয়া গ্রামের কৃষক মো. আলাল মিয়া বলেন, ‘আমার প্রায় সাত একর জমির ধান বন্যায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে| একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি অথচ আমার নাম তালিকায় নেই| কিন্তু যাদের জমিই নেই কিংবা ক্ষতি হয়নি, তাদের নাম তালিকায় রাখা হয়েছে|’ একই গ্রামের কৃষক ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আমার বেশিরভাগ ফসল বিলে ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে| সরকারের এই সহায়তা পেলে অনেক উপকার হতো, কিন্তু তালিকায় আমার নাম নেই|’ এ বিষয়ে তেতুলিয়া ইউনিয়নের ১ ন¤^র ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি| তেতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা আছে| ইউনিয়নে প্রায় ৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| কিন্তু প্রণোদনার কার্ড এসেছে ১ হাজারেরও কম| তাই সবাইকে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি|’ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, যদি কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ করেন, তাহলে যাচাই-বাছাই করে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে| এমনকি ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক ইউপি সদস্যের স্ত্রীর নামেও প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ এসেছে| সেটিও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে| সরকারের বিশেষ কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাসের জন্য প্রতি মাসে ১৫ কেজি করে চাল, নগদ ৩ হাজার টাকা দেয়ার কথা রয়েছে| ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদে উৎসাহিত করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য| মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেন খাতুন বলেন, ‘যেসব প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তারা আমার বরাবর লিখিত আবেদন করতে পারেন| যাচাই-বাছাই শেষে তাদের প্রণোদনার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে| একইসঙ্গে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে|’ আগাম বন্যায় ফসল হারিয়ে দিশেহারা নেত্রকোণার হাজারো কৃষক| তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে সুবিধা দেয়া হচ্ছে প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠদের| প্রশাসন বলছে, অভিযোগ পেলে হবে তদন্ত| এখন দেখার বিষয়, প্রণোদনা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে পৌঁছায় কি না|
Leave a Reply