শিক্ষা মানে শুধু ফলাফল নয়, শিক্ষা মানে মানুষ গড়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দিন দিন “শেখা”র চেয়ে “চাপ” বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আজ প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা—সব জায়গাতেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপর এক অদৃশ্য মানসিক নির্যাতন চলমান। শুধু নিয়ম, নির্দেশনা, রিপোর্ট, চাপ আর ফলাফলের প্রতিযোগিতা। অথচ কেউ কি ভেবে দেখছে—একটি শিশু কি আসলেই এভাবে শেখে? শিশু কোনো যন্ত্র নয় যে সারাক্ষণ শুধু পড়বে। শিশু শেখে আনন্দে, খেলায়, স্বস্তিতে, ভালোবাসায়। পরীক্ষার মাঝেও যদি বিশ্রামের সুযোগ না থাকে, তাহলে শিক্ষা নয়, সেটি হয়ে যায় মানসিক চাপের কারখানা। আরেকটি বিষয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক—শিক্ষার ব্যর্থতার পুরো দায় শিক্ষকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া।
কিন্তু শিক্ষা কি শুধুই শিক্ষকের একার দায়িত্ব? একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ হলো— পরিবার, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক। এই তিনটির যেকোনো একটি দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশের অসংখ্য শিশুর পরিবার এখনো শিক্ষার মৌলিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। অনেক বাবা—মা জানেন না তাদের সন্তান কোন শ্রেণিতে পড়ে, নিয়মিত স্কুলে যায় কিনা, কিংবা পড়াশোনার অবস্থা কী। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, পারিবারিক অস্থিরতা—এসব বাস্তবতার মধ্যেই শিক্ষকরা প্রতিদিন যুদ্ধ করে শিশুদের স্কুলমুখী রাখেন। তবুও বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে শুধু হুমকি, চাপ এবং দায় চাপানোর সংস্কৃতি চলছেই। কেউ জানতে চায় না— একজন শিক্ষক কী প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কাজ করেন। কেউ মাঠে নেমে হাতে—কলমে শেখাতে আসেন না, কিন্তু ভুল ধরতে সবাই প্রস্তুত।
শিক্ষককে ভয় দেখিয়ে নয়, সম্মান দিয়ে কাজ আদায় করতে হয়। কারণ একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষকই পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে। সরকারের কাছে বিনয়ের সাথে আহ্বান—শিক্ষকবান্ধব নয়, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং বাস্তবতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলুন। শুধু শতভাগ পাশের লক্ষ্য নয়, শতভাগ মানবিক মানুষ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা ও শেখার আনন্দকে গুরুত্ব দিন। শিক্ষকদের উপর অযৌক্তিক চাপ কমিয়ে তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করুন। মনে রাখবেন—একটি জাতিকে ধ্বংস করতে যুদ্ধ লাগে না, সেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিলেই যথেষ্ট। শিক্ষাকে প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, মানুষ গড়ার কারখানা হতে দিন।
Leave a Reply