1. admbm8z3m@example.com : admbm8z3m :
  2. admin@dainikdeshkanthaswar.com : admin :
  3. administrator_aa6faeec92@dainikdeshkanthaswar.com : administrator_aa6faeec92 :
  4. bot@local.invalid : Service Bot :
  5. dainikdeshkanthaswarnl@outlook.com : gujzamuw :
  6. lark37655@dainikdeshkanthaswar.com : lark37655 :
  7. dainikdeshkanthaswarqg@outlook.com : lesabken :
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৪ অপরাহ্ন

কলিকাতা কবি নজরুলের বীরোচিত সংবর্ধনা ও খালেকদাদ চৌধূরী————————————————-বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধূরী

  • আপডেট সময়ঃ রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
  • ৩৪৭ দেখা হয়েছে
বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধূরী
বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধূরী

বাংলাদেশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, তাকে নিয়ে আমাদের গর্ব ও গৌরবের অন্ত নেই। তিনি বাঙালীর বিদ্রোহের চেতনা শানিত করেছেন। আমাদের অনুভব শক্তিকে ধারালো করেছেন। বাঙ্গালীর মনের প্রসারতা ঘঠিয়েছেন। বাঙ্গালীর দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করতে শিখিয়েছেন। তার কবিতা ও গান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা যোগিয়েছে। আমরা আমাদের যৌবনের সোনালী দিনগুলো স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে বিলিয়ে দিতে পেরেছিলাম, তার গান ও কবিতার উদিপ্ত প্রেরণায়। জাতীর যে কোন দুযোর্গ মোকাবেলায় কবির কবিতা প্রেরণা যোগিয়েছে। স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়। দারিদ্রতা মুক্তি, সামাজিক মুক্তি, অজ্ঞতা থেকে মুক্তি ও শোষন মুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন। উপনিবেশিক শাসন—শোষনের বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন, স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে জাতীকে জাগরিত করেছেন। কবি নজরুল ছিলেন স্বাধীনতার কবি, সাম্যের কবি, প্রেম ও দ্রোহের কবি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে অনেক গল্পকথা আমি আমার পিতা প্রয়াত কথা সাহিত্যিক খালেক দাদ চৌধূরীর কাছ থেকে শুনেছি এবং পাঠ্যপুস্তকেও পড়েছি। কথা সাহিত্যিক খালেক দাদ চৌধূরী তার ছাত্র জীবন ও কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন বিভাগপূর্ব কোলকাতায়। সেখানে তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন এবং তার সান্নিধ্যে থেকে কাজ করেছেন। বিশেষ করে কোলকাতার বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। বিভাগপূর্ব বাংলার মূখ্য মন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কতৃর্ক প্রতিষ্ঠিত ও কবি নজরুল সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় কাজ করেছেন। সেই সুবাদে খালেক দাদ চৌধূরী কবি নজরুলকে দেখেছেন এবং তার সংগে কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো। কবি নজরুলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা কোলকাতায় তরুন প্রগতীশীল মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে রেঁনেসা যুগ সৃষ্টি হয়েছিলো সেই সময়ে খালেক দাদ চৌধূরী একজন উদিয়মান সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসাবে বিভাগপূর্ব কলিকাতার রাজনীতি, সাংস্কৃতি, সাহিত্যে নিজে জড়িত থেকে কোলকাতায় বিভিন্ন সাময়িকিতে লেখা দিয়েছেন। তৎকালীণ সময়ে কোলকাতা এবং ঢাকায় মুসলীম সাহিত্য সমাজ বুদ্ধিমুক্তির যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা তৎকালীণ বাংলার মুসলীম ছাত্র সমাজকে আন্দোলিত করেছিলো। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের মূল প্রেরণাদাতা। তারা শত শত বৎসরের কুসংস্কার এবং নানা অন্ধ বিশ^াস হতে মুক্ত হতে চেয়েছিল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুক্তির ফোয়ারা খুলে দিয়েছিলেন। সেই ফুয়ারার জলে অবগাহন করে কুসংস্কার এবং অন্ধ বিশ^াসের ক্লেদ হতে মুক্ত হচ্ছিল তরুণ শিক্ষিত মুসলিম। যার যেখানে যতটুকু শক্তি তাই নিয়ে তরুন মুসলিম কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক কলম ধরে ছিলেন। ওদেরই একজন ছিলেন খালেক দাদ চৌধূরী। ঐ সব মুসলিম কবি সাহিত্যিকগণ কবি কাজী নজরুলকে প্রধান সম্পাদক করে পরিশীলন সমিতি গঠন করে কবি কাজী নজরুলকে জাতির পক্ষ থেকে কোলকাতার এলবার্ট হলে এক বিরোচিত সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। সে সংবর্ধনা নিয়ে খালেক দাদ চৌধূরী তার জীবনী গ্রন্থ ‘শতাব্দির দুই দিগন্ত’ গ্রন্থে একটি সুন্দর ও চমৎকার রেখা চিত্র অংকন করেছেন। পাঠকের জানার জন্য এখানে তা উদ্ধৃত করা হলো। খালেক দাদ চৌধুরীর ভাষায় ‘১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর রবিবার জাতির পক্ষে কবি কাজী নজরুল ইসালামকে এক সংবর্ধনা জানানোর আয়োজন করা হয়। কবি তখন সারাদেশে অনন্যসাধারন কবি প্রতিভার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত গতানুগতিক ধারাকে ভেঙ্গে এক নতুন প্রাণপ্রাচুর্য ও অভিনবত্বের এক নতুন সুর সংযোজন করে জাতির প্রাণে এক অভূতপূর্ব স্পন্দন ও জাগরণের প্রেরণা সঞ্চার করলেন। বাংলার মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজে তার নতুনের প্রতি জাগরণের প্রেরণা জাগিয়ে তোলে। শুরু হয় নতুন ও তরুণের জয়যাত্রা। আত্নকেন্দ্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তার সুখ্যাতি বরদাস্ত করতে পারেনি। মুসলিম প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাকে ধর্মদ্রোহী কাফের বলে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে এক জঘণ্য প্রচার অভিযানে মেতে উঠে। অন্য দিকে হিন্দু কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই তার এই সুখ্যাতিতে ঈর্ষাপরায়ন হয়ে উঠে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারনা শুরু করে দেয়। মুসলিম মুক্তবুদ্ধি ও চিন্তাবিদ সাহিত্যিক ও তরুণরা এর প্রতিকার বিধানের কথা চিন্তা করতে শুরু করেন। তখনকার সময় “সওগাত’ কে কেন্দ্র করে প্রগতিশীল মুসলিম কবি সাহিত্যিক তরুণরা এর প্রতিকার উদ্ভাবনের কথা আলোচনা করেন। শেষে একদিন স্থির হয় কবিকে জাতির পক্ষ থেকে এক বিরাট সংবর্ধনার আয়োজন করার এবং অবিলম্বে তার ব্যবস্থা করার। সেদিন থেকেই তারা আয়োজনে লেগে যান। কিছুদিনের মধ্যে ১৯২৯ সালে অক্টোবর মাসে কোলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে এক সাধারণ সভা ডাকা হয়। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এতে ভিষণভাবে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে। সাধারণ সভার দিন নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই ওরা কিছু সংখ্যক লোক নিয়ে মুসলিম ইনস্টিটিউট হলের প্রায় সকল আসন দখল করে নেয়। যাতে সভার উদ্যোক্তাদের চেষ্টা ব্যার্থ হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক সময়ে উদ্যোক্তারা সদলবলে সেখানে উপস্থিত হয়। তাদের চেষ্টায় প্রতিক্রিয়ালীলদের সকল ষড়যন্ত্র ব্যার্থ হয় এবং ওরা সেখান থেকে বিতাড়িত হয়। উদ্যোক্তাদের প্রকৃত ব্যাপার প্রকাশ করে তাদের যুক্তিপূর্ণ আবেদনে উপস্থিত সবাই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারে। এবং বিপুল সংখ্যাক মানুষ আহবানকারীদের সমর্থন জানায়। প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্র নস্যাত হয়ে যায়। কবিকে সংবর্ধনা জানানোর প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। মি. এস ওয়াজেদ আলী বার—এট—ল কে সভাপতি করে এক শক্তিশালী অভ্যর্থনা ও প্রস্তুতি কমিটি হয় এবং দিন তারিখ সময় ও স্থান নির্ধারিত হয়। সংবর্ধনার মূল সভাপতি নির্বাচিত হন বিজ্ঞানাচার্য ড. প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন কল্লোল পত্রিকার দীনেশ দাশ ও সওগাত সম্পাদক মোঃ নাসির উদ্দিন। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় সংবর্ধনা উদ্যোগ আয়োজন শুরু হয়ে যায়। অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নিশ্চুপ থাকেনি। তারা সংবর্ধনাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও চেষ্ঠায় মেতে উঠে। ষড়যন্ত্রকারীরা সংবর্ধনা সভায় মারামারি গোলমাল হবে প্রচার করতে থাকে। কিন্তু তাদের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ করে নিদ্দির্ষ্ট দিনে নিদ্দির্ষ্ট সময়ে কোলকাতার এলবার্ট হল শ্রোতা ও দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। হলে তিল ধারনের স্থান ছিলোনা। কোলকাতার বাহিরে দুরদুরান্ত থেকেও বহু উৎসাহী কবি সাহিত্যিক ও উৎসাহী তরুণ উপস্থিত হন। হলে স্থান না পেয়ে বহু লোক সিড়ি ও রাস্তায় হলের বাহিরে দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। নিদ্দির্ষ্ট দিনে নির্ধারিত সময়ে বিচিত্র সাজে সজ্জিত মোটরে করে ‘সওগাত’ অফিস থেকে এলবার্ট হলে কবিকে নিয়ে আসা হয়। অপেক্ষামান বিপুল জনতা আনন্দধ্বনী দ্বারা কবিকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানায়। কবির বিখ্যাত গান “চল চল চল উর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল” দিয়ে সভার কাজ আরম্ভ হয়। তার পরেই মূল সভাপতি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এক মনোজ্ঞ ভাষন দেন এবং কবিকে অভিনন্দন জানান। তার ভাষণের পরেই কবি কাজী নজরুলকে দেয়া অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন। শ্রোতা দর্শক মন্ডলীর প্রাণ মাতানো ও হল কাপানো হর্ষধ্বনি ও করতালির মধ্যে আচার্য রায় রূপার কাসকেটে ভর্তি অভিনন্দনপত্র, একটি স্বর্ণ নির্মিত দোয়াত—কলম কবির হাতে তোলে দেন। অভিনন্দনের উত্তর দিতে দাড়াঁনো মাত্রই হর্ষোল্লাসিত জনতার দীর্ঘস্থায়ী আনন্দধ্বনি হলটি বেশ কিছুক্ষণ মুখরিত রাখে। কবি তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর কন্ঠে অভিনন্দনের জওয়াব দেন প্রাণ মাতানো ভাষায়। কবির জওয়াব প্রদানের পর কয়েকটি গান হয়। এরপর জননেতা সুভাষ চন্দ্র বসু তার ভাষণ দেন। তার সেদিনের বক্তৃতার উক্তি ভবিষ্যতবাণী হয়ে বাস্তবায়িত হয়ে উঠেছিলো। তিনি কবিকে সম্ভোধন করে বলেছিলেন, “আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখন সেখানে নজরুলের গান গাওয়া হবে, যখন কারাগারে যাব তখনও তার গান গাব” সভা শেষে আচার্য রায়, সুভাষ বসু ও জনতার অনুরোধে কবি “জনদল চলে সময়ে” এবং “দুর্গমগিরি কান্তার মরু’’ গান দুটি গেয়ে সকলকে সম্মোহিত করে ফেলেন। বিপুল হর্ষধ্বনি ও আনন্দ কলরোলে বিরাট এলবার্ট হল প্রকম্পিত করে জনতা ধীরেসুস্থে হল ত্যাগ করে। পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসন শোষনের যাতাকল থেকে বাঙ্গালী জাতির মুক্তির লক্ষ্যে মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বাঙ্গালী জাতির উন্মেষ গঠিয়ে আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতিকে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়ার পেছনে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা অনুসঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে ও প্রেরণা যোগীয়েছে। বাঙ্গালী জাতিকে মুক্তির আলো ও পথ দেখিয়েছে, বাঙ্গলীর হৃদয়ে স্বাধীনতার বীজ বোপন করে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে জাতিকে মুক্ত করেছে নজরুলের গান ও কবিতা। ঘুমন্ত বাঙ্গালীকে জাগিয়ে তোলতে কবির জাগরণি গান জাতির প্রেরণার উৎস। বাঙ্গালি জাতি জাগরণের কবি নজরুলকে ভারত থেকে এনে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসাবে মর্যাদা দিয়ে নাগরিকত্ব ও পূণবার্সিত করে দায়মুক্ত হয়েছে।
লেখক, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক।
তথ্যসূত্র ঃ খালেক দাদ চৌধূরী এঁর লেখা আত্নজীবনী গ্রন্থ “শতাব্দীর দুই দিগন্ত”।

 

সামাজিক মাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর